ভালোলাগার ভরতপুর - প্রথম পর্ব

ভালোলাগার ভরতপুর 
প্রথম পর্ব


























































































                              

                   


 





সালটা ২০১৫ হঠাৎ করে প্লান ঠিক হল ভরতপুর যাবার। চারজন আমি, সায়নত্ন, ভৌমিক দা আর সেই আমাদের রাগী দীপঙ্কর। ৬ই ডিসেম্বর ২০১৫ রাত্রি ১১:৫৫ তে যোধপুর এক্সপ্রেস ট্রেন। অনেক রকম প্লানিং চলছে রোজ, ধীরে ধীরে দিন এগিয়ে আসতে শুরু করল। আর মাত্র ১৫ দিন কিন্তু হঠাৎ করে ইন্দ্রপতন দীপঙ্কর আর সায়নত্ন যেতে পারবে না কিছু ব্যক্তিগত কারনে। রইলাম হাতে ২ আমি আর ভৌমিক দা। চেষ্টা চলছিল যদি যেতে পারে ওরা দুজন শেষ ৫ দিন আগে এসে হটাৎ করে আরো বড়সড় মেঘ ঘনিয়ে এলো, এবার ভৌমিক দা অফিস থেকে ছুটি বাতিল করে দিয়েছে। ব্যাস ষোলকলা পূর্ন। সিদ্ধান্ত নিলাম যাইহোক না কেন একাই যাব স্বপ্নের ভরতপুর। সেইমত ভরতপুর আমাদের থাকার জায়গাতে মানে "Hotel Spoonbill এর হরিশ জি কে ফোন করে জানিয়েছিলাম যে ৪ জনের বদলে আমি একাই আসছি, সেইমত ২টো রুমের ১টি বাতিল করেছিলাম। খারাপের মধ্যে ভালো খবর ৫তারিখ ভৌমিক দা জানালো অফিস এ ম্যানেজ করার একটা শেষ চেষ্টা করছে। আশায় মরে চাষা সেই ভাবেই অপেক্ষা করছি । ৬ই ডিসেম্বর বেলা ১টা বেজে গেছে কিন্তু ভৌমিক দা এখনো কিছু জানায়নি। অবশেষে আমিই ফোন করলাম কিন্তু রিং হয়ে গেল ফোন আর ধরলো না। আরো খানিকক্ষণ অপেক্ষা করে আবার একটা ফোন করলাম ফোন ধরলো শালিনী (ভৌমিক দার মেয়ে) ফোন ধরেই হাসতে হাসতে বলেই ফেলল বাবা যাবে গো এখন ব্যাগ পত্তর গোছাতে শুরু করে দিয়েছে😁😁😁 তোমাকে বলেনি। যাকগে একটু নিশ্চিন্ত হওয়া গেল। ঠিক হল ৯:৩০ এর নৈহাটি লোকাল ধরে শিয়ালদা যাবো। আর সেখান থেকে হাওড়া। কলকাতা তে সেদিন ঠান্ডার ঠ ও ছিলোনা। বেরিয়ে পড়লাম ভরতপুরের উদ্দেশ্যে। হাওড়া স্টেশনে পৌঁছে কয়েকটা প্রয়োজনীয় জিনিস কিনে উঠে পড়লাম ট্রেনে। সময় মতই ট্রেন ছাড়লো। ভরতপুরে পৌঁছানোর কথা ৭ তারিখ রাত ৯:৩০ মিনিটে। আমাদের দুজনেরই ছিল আপার বার্থ । বাগপত্তর লক করে যে যার মতো বার্থ এ উঠে শুয়ে শুয়ে গল্প করা শুরু করলাম। অত রাতেও একজন ঠিক ফোন করে খবর নিলো আর তারসঙ্গে একটুকরো টাটকা বাতাস এর মত হাসিয়ে দিলো, আমার অনন্ত প্রিয় বন্ধু অরিত্র। হয়ত ও না থাকলে আমি এরকম হটাৎ করে ভরতপুর যাবার সিদ্ধান্তই নিতাম না। এমনকি যখন একে একে সবাই ক্যান্সেল করে দিয়েছিল তখন ওই কোনস্টান্ট আমাকে বলে গাছে যাবি যখন ঠিক করেছিস তখন একাই যা। যাইহোক আকাশ পাতাল ভাবতে ভাবতে, ভরতপুর নিয়ে এতদিন ইন্টারনেট এ বিভিন্ন ভিডিও দেখে যেসব তথ্য জোগাড় করেছিলাম সেগুলো নিয়ে আমি আর ভৌমিক দা আলোচনা করতে করতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম সে আর খেয়াল নেই। সকাল বেলা ঘুম ভাঙল যখন তখন দেখি কোডার্মা স্টেশনে ট্রেন দাঁড়িয়ে আছে। নীচে নেমে চা টা খেলাম হটাৎ খেয়াল পড়ল কোডার্মা তো ভোর ৫টা নাগাদ আসার কথা এখন তো প্রায় পৌনে ৭টা বাজে, তারমানে প্রায় ২ঘন্টার কাছাকাছি লেট চলছে ট্রেন। যাই হোক যেটা আমাদের হাতে নেই সেই নিয়ে বেশি না ভেবে যেটা আমাদের হাতে আছে তাই শুরু করেদিলাম আমরা মানে পেট পূজা😄। এবার শুরু হল আমাদের সহযাত্রী দের সঙ্গে একটু কথা বলার চেষ্টা, এক পরিবার চলেছে আমাদের সঙ্গে বা বলা ভালো আমরা চলেছি ওনাদের সঙ্গে ওনারা আসে পাশের কূপ মিলিয়ে ২০ জন আছেন আর আমরা ২ জন। ওনারা কলকাতা নিবাসী রাজস্থানী পরিবার। রাজস্থানের চুরু তে ওনাদের আদি বাড়ি। যেটা আসল কথা সেটা হলো এনাদের ফুড-হাবিট, ওনারা নিজেদের সঙ্গে প্রচুর খাবার দাবার এনেছিলেন তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ভাবে যেটা ছিল বিভিন্ন রঙের পরটা বা রুটি। ওনাদের থেকে একটা মন্দিরের গল্প শুনেছিলাম, আসলে ওনাদের মধ্যে কয়েকজন ওই মন্দিরে নাকি পুজো দিতে যাবেন। সেটা নাকি ভুত তাড়াবার মন্দির। রাজস্থানের একটি গ্রাম মেহেদি গ্রামের বালাজি মন্দির। যাক গে সেই গল্প নিয়ে আমি আর খুব একটা বেশি মনোনিবেশ করিনি। কারন টা আমার অনেক বন্ধুই জানে😁😁😁😁😁। নেই কাজ তো খই ভাজ লাঞ্চ সেরে আবার শুয়ে পড়া। বিকেলে সন্ধ্যা নাগাদ হরিশ জি কে ফোন করে আমাদের রাতের খাবারের অর্ডার টা ক্যান্সেল করে দিলাম কারন ট্রেন ততক্ষণে ঘন্টা চারেক লেটে চলছে। মানে খুব তাড়াতাড়ি পৌঁছলেও ১২:৩০ এর আগে পৌছাচ্ছি না। আবার অরিত্র এর ফোন যদি বেশী লেট হয় তাহলে যেন আমরা ওয়েটিং রুমে থেকে যাই। কারন স্টেশন থেকে আমাদের হাই রোড হয়ে হোটেলে যেতে হবে আর উত্তর ভারতের কুয়াশা তো বিখ্যাত। আমরাও তাই ঠিক করলাম যে আজকে রাতটা স্টেশনেই কাটাব। নামলাম ভরতপুর স্টেশনে, শুধু দুটি প্রাণী আমি আর ভৌমিক দা। রাত্রি ০২:৫৫ মানে নামার কথা ছিল, ৭তারিখ ৯:৩০ মিনিটে ৫ঘন্টা ২০মিনিট পরে ৮ তারিখে , হাড়হিম করা ঠান্ডা। আমিতো তাড়াতাড়ি জ্যাকেট পরে নিয়েছি, কিন্তু ভৌমিক দা তাড়াহুড়ো তে ব্যাগের চাবি কোথায় রেখেছে মনে করতে পারছে না। অগত্যা আমার একটা হাফ হাতা সোয়েটার পরে কাঁপতে কাঁপতে এগিয়ে চলল ওয়েটিং রুমের দিকে। তবে ওয়েটিং রুমে পৌছে আমার প্রথম যেটা মনে হলো সেটা হলো রাজস্থানের ওই ভূত তাড়ানোর মন্দিরের কথাটা। একটা লম্বা বড় ঘর স্টেশনের শেষ প্রান্তে একটা টিমটিম করে টিউব লাইট জ্বলছে, আমি শুধু একবার তাকিয়ে বললাম আমি এখানে থাকবো না যা হবার হবে। ফোন করলাম হরিশ জীকে অতরাতেও ভদ্রলোক একটুও না রাগ করে আমার ফোন ধরে বললেন কোনো অসুবিধা নেই স্টেশনের বাইরে এসে অটো ভাড়া করে চলে আসুন। বাইরে এসেই যেন একটুকরো রাজস্থানের, যে ছবি ছোটবেলা থেকে মনের গভীরে ফেলুদা, রাজস্থান আর সত্যজিৎ । কয়েকজন দেহাতি মানুষ আগুন পোহাতে পোহাতে গান গাইছে। একটা চায়ের দোকান খোলা, ভাবলাম প্রথমেই একটা ছোটবেলার আশা পূরণ কোরেনি,  "ফেলুবাবু এটা কি উটের দুধের চা"- তবে সেটা আর জিজ্ঞাসা করার সময় পেলাম না বা বলা ভালো সাহস হলো না ঠান্ডার মধ্যে বেশি কথা বলতে। ভৌমিক দা ইতিমধ্যে একটা অটো ঠিক করে ফেলেছে Hotel Spoonbill এ যাবার জন্য। অটো তে উঠে যেতে যেতে কুয়াশার ঘনত্ব দেখে যেটা বুঝতে পারলাম কেন উত্তর ভারতে শীত কালে ট্রেন এত লেটে চলে। চাপ চাপ কুয়াশা কিছুই দেখা যাচ্ছে না। অটোওলা ফগ লাইট জ্বালিয়ে অটো চালাচ্ছে। তাতেও কিছুই দেখা যাচ্ছে না। ভোর ৪টের আসে পাশে পৌছালাম আমরা Hotel Spoonbill এ হরিশ জী আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন, আমাদের জন্য যে ঘরটি রেখেছিলেন সেটি একতলায় তাই আর কষ্ট করে ওপরে উঠতে হলো না কোনো মতে শরীরটা টেনে নিয়ে গিয়ে শুয়ে পড়লাম, শুয়ে পড়ার আগে হরিশ জী বললেন আপনারা কালকে একটু দেরি করে ব্রেকফাস্ট করে বেরোবেন। হা টুকু বলেই সোজা ঘুমের দেশে।

ঘুম থেকে উঠে হরিশ জীর সঙ্গে পরামর্শ করতে করতে প্রয়োজনীয় তথ্য জোগাড় করে নিলাম পার্ক সম্পর্কে, উনি জানালেন যে ওখান থেকে একটি রিক্সা নিয়ে বা হেটে যেতে হবে আমাদের কাঙ্খিত Keoladeo Ghana National Park এর গেটে। সেখান থেকে আবার টিকিট কেটে পার্ক এর ভেতরে যেতে হবে, সেখানে দুটি পদ্ধতিতে ঘোরা যাবে ১. সাইকেল ভাড়া করে, সেক্ষেত্রে একজন গাইড কে সঙ্গে নিতে হবে (গাইড ভাড়া ঘন্টা পিছু ১০০/-) অথবা ২. রিক্সা ভাড়া করে নিতে হবে (ঘন্টা পিছু ১০০/-) ওনার পরামর্শ অনুযায়ী আমরা ঠিক করলাম আজকের দিনটা রিক্সা করেই ঘুরবো সেক্ষেত্রে আমাদের বাগপত্তর রাখা সুবিধা আর ক্যামেরা সঙ্গে নিয়ে সাইকেল চালানোর কোন ঝামেলা থাকবে না। ব্রেকফাস্ট করে আর দুপুরের খাবার জন্য আলুর পরটা সঙ্গে প্যাক করে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম আমরা ন্যাশনাল পার্ক এর উদ্দেশ্যে। পথে আসতে আসতে অন্তত ১০ জন রিক্সাওলা আমাদের কে অনুরোধ করলো যে তাদের রিক্সা নিয়ে পার্কের মধ্যে ঘুরতে। আমরা সবাই কে এড়িয়ে অবশেষে পৌঁছলাম Keoladeo Ghana National Park এর গেটে।



 Entrance Gate of Keoladeo Ghana National Park, Bharatpur.

পার্কের ভেতরে ঢুকতেই কেমন যেন একটা মন ভালো করা অনুভূতি হলো। কাউন্টার থেকে টিকিট কেটে রিক্সা এর জন্য লাইন এ দাঁড়াতেই যিনি এগিয়ে এলেন তার নাম টোটা সিং। ওনার নিজের দাবী অনুযায়ী উনি পার্কের অন্যতম পুরোনো রিক্সা চালক তথা গাইড। শুরু হল আমাদের ভ্রমন।

টোটা জী আর ভৌমিক দা

শুরুতেই যে দৃশ্যটা চোখে পড়লো একটা মরা গাছে সার দিয়ে এতো পাখি যে থাকতে পারে আমার কোনো ধারনাই ছিলোনা। চেনা পাখির ভিড়ে একটি অচেনা পাখিও পেলাম|প্রথমবার দেখা পেলাম গোলাপি শালিখের।

Rosy Straling - গোলাপি শালিখ

                                         Rosy Straling - গোলাপি শালিখ                                                      

  সামনে এগোতেই ডান দিকের খুঁটির ওপর আর এক ধরনের শালিখ পাখির দিকে নজর পড়ল ইনি আবার পন্ডিত মহাশয়।


Brahimny Starling

 
সামনে একজায়গা থেকে প্রচুর পাখির কোলাহল ভেসে আসছে । টোটা জী জানালেন সামনে Painted Stork এর colony আছে। ওখানে গিয়ে আমরা সত্যিই অবাক হয়ে গেলাম। টোটা জীর কাছে শুনলাম যে আগে নাকি এরা migration করে আসতো। কিন্তু শেষ অনেক বছর ধরে resident হয়ে গেছে। আর এটা সম্ভবত painted stork এর সবচেয়ে বড় colony। আমরা ঠিক করলাম ওখানে বসেই সেইদিনের দুপুরের খাবার খাবো বলে ঠিক করে নিলাম। সঙ্গে আনা আলুর পরটা, আচার আর টক দই দিয়ে Painted Stork দের বিভিন্ন কার্যকলাপ দেখতে দেখতে প্রকৃতির নীচে lunch টা করে নিলাম। তবে আলুর পরটার যা সাইজ তাতে আমরা একটা করে খেয়েই lunch এর প্যাকেট গুটিয়ে ফেললাম। খেতে খেতেই দেখছিলাম painted stork দের কার্যকলাপ। পুরো জলাভূমি জুড়ে শুধু ওদেরই রমরমা আর বিভিন্ন রকমের কার্যকলাপ। কখনো মা painted stork তার বাচ্চাদের জন্য খাবার নিয়ে এসে খাওয়াচ্ছে, কখনো ডানা দুটিকে দুদিকে মেলে দিয়ে বাচ্চাদের মাথায় যেনো ছাতা ধরছে। lunch করে একটু বিশ্রাম নিতে নিতে টোটা জির কাছে ভরতপুরের বিভিন্ন গল্প শুনতে লাগলাম।।।।


Comments

  1. খুব সুন্দর অভিজ্ঞতা ❤️
    পরবর্তী পর্বের জন্য অপেক্ষায় রইলাম।।

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

ডানলিন

রাজদরবারে অলিন্দে