রাজদরবারে অলিন্দে

রাজদরবারের অলিন্দে

            
    শুক্রবার দুপুর বেলা প্রসিল এর ফোনে অফিসের কাজের ফাঁকে মনে পুলক জেগে উঠলো, "রবিবার কোথায় যাবে? - প্রসিল এর এহেন প্রশ্নে যেন হুশ ফিরল, চল কোথাও যাই, তবে একটা নতুন কোনো জায়গায় যাই চল এক জায়গায় যেতে আর ভালো লাগছে না। 
"বাড়ুইপুর যাবে"? একবারেই উত্তর চল। 

রবিবার ভোরবেলায় বেরিয়ে পড়া, প্রসিল কে ডানলোপ থেকে বাইকে তুলে চললাম অভিষেক এর বাড়ির উদ্দেশ্য, যথারীতি সময় মত পৌঁছে গেলেও মহারাজ যথারীতি রেডি হননি। অগত্যা আরো 40 মিনিট সময় অতিবাহিত করে তবে রওনা হওয়া গেল বাড়ুইপুর জেলা সদন এর উদ্দেশ্যে। পৌঁছানোর পথে অন্তত বার তিনেক শান্তনু আমাদের খোঁজ নিলো যে আমরা কতদূর? শান্তনু আমাদের আর এক সঙ্গী। যাক অবশেষে এসে পৌঁছলাম আমরা। বাড়ি থেকে 4:45 এ বেরিয়ে 6:30 টায় অবশেষে পৌঁছনো সম্ভব হলো বাড়ুইপুর। তখনও তো আমরা জানিনা কি অপেক্ষা করে আছে আমাদের জন্য। যাইহোক জায়গাটা তে এর আগে আমি বা আমরা কেউ কোনোদিন যায়নি।


জায়গাটা অনেকটা জায়গা নিয়ে একটা জলাভূমি। যার ডানদিকের জমিটাই আমাদের মূল আকর্ষণ এর কেন্দ্র। ব্যাগ থেকে camera বের করতে করতেই মাথার ওপর দিয়ে একটা নয় দু-দুটো Cinnamon Bittern উড়ে গেল,চোখের পলক পড়তে না পড়তেই Purple Heron এসে পেছনের জলা ভূমি তে নেমে গেল। প্রথম ডান দিকের সরু আলপথ টা ধরতেই বোঝা গেল কোন স্বর্গরাজ্যে এসে পড়েছি।ডান দিকের জমা জলের অংশটা কে দেখে মনে হলো যেন আবছা আলোয় লুকিয়ে থাকা কোনো স্বপ্নপুরীর অংশবিশেষ। 

ঠিক তার উল্টো প্রান্তের জলাভূমি যে ততক্ষনে 
Greater Painted Snipe   (Image:- Prasenjit Bhattacharjee)

এর ওড়াউড়ি শুরু হয়ে গেছে, হটাৎ করে শান্তনু বলল "দাদা একটা কোয়েলের মতো পাখি", ব্যাস সবার মনে একটাই প্রশ্ন কি কোয়েল, snipe এর ছবি হলো কি হলো না সব মাথা থেকে বেরিয়ে গেল, খুব তাড়াতাড়ি শান্তনু আর অভিষেক সামনে বসে পড়লো, আমি আর প্রসিল ওদের পেছনে, আমি তো মোটামুটি আমার লেন্স টা শান্তনুর কাঁধে রেখে অপেক্ষা করতে লাগলাম। প্রতিটা সেকেন্ড এর কাটা ঘুরছে কিন্তু অপেক্ষা আরো দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে, সবার চোখ একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে সামনের সরু ঘাস জমিতে। সবাই জানি যে কোয়েল ই হোক না কেন, বেশিক্ষণ সময় আমরা পাবনা। 7:00 থেকে অপেক্ষা করতে করতে কখন যে ঘড়ির কাঁটা 7:25 তে পৌঁছে গেছে জানতেও পারিনি। হটাৎ ডানদিকের ঘাসজমি তে একটা কিছুর উপস্থিতি লক্ষ্য করে আমাদের দৃষ্টি আরো সজাগ হয়ে উঠলো। না আমাদের কাঙ্খিত পাখিটি নয় একটি Zitting Cisticola ঘাসজমির ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো আমাদের হতাশ করে। আমরা নিজেদের মধ্যে ধীরকণ্ঠে আলোচনা করছি যে আজ হয়ত আমাদের ভাগ্যে দেখা নেই। কিন্তু ভাগ্যদেবতা হয়ত আমাদের সহায় ছিলেন, ঠিক তখনই বাঁদিকের জমি থেকে বেরিয়ে এলেন কোয়েল মহাশয়। তার পিছন পিছন এল তার 4 জন সন্তান আর তার পর এলেন তার সহধর্মিণী। এবারও ঠিক ঠাক ছবি হলো না, কিন্তু তথাকথিত "RECORD SHOT" হোলো, সৌজন্যে দুপাশের ঘন ঘাসের উচ্চতা আর কোয়েল পরিবারের দ্রুত রাস্তা পারাপারের দক্ষতা।

Blue Breasted Quail ( Male & Juvenile One) (Image:- Prasenjit Bhattacharjee)



যাইহোক সেই আবার একই নিয়ম করে চুপ করে বসে থাকা, যদি আবার রাস্তা পার করে তো দেখা পাওয়া যায়। চারিদিকে কোথায় কি হচ্ছে তা আর আমাদের মাথায় নেই, শুধু হওয়ার আওয়াজ, আর আমাদের নিজেদের শ্বাস প্রশ্বাস এর শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ আমার অন্তত কানে ঢুকছিল না, পরে অবশ্য জেনেছি আমার একার নয় সকলেরই একই অবস্থা ছিল সেই সময়। 8:12 am এ তিনি এসে আবার দেখা দিলেন সেই একই ভঙ্গিতে প্রথমে পুরুষ পাখিটি ঘন ঘাসজমি থেকে অল্প মুখ বার করে আমাদের কে পর্যবেক্ষণ করে, কোন বিপদের আঁচ না পাওয়াতে কিছু একটা ইঙ্গিত করে তার সঙ্গিনী পাখিটি ও 4 টি বাচ্চা কে, একে একে সবাই তার পিছু পিছু ঘাসজমির ডানদিক থেকে দ্রুত বেরিয়ে বাঁদিকের ঘাসজমির অন্তরালে প্রবেশ করে গেল।

Blue Breasted Quail ( Female)Image:- Prasenjit Bhattacharjee)

এইবার সবারই দু-একটা করে ছবি হলো, কিন্ত কি কোয়েল চেনা পরিচিত কোনো কোয়েল এর সঙ্গে তো মিল কম। প্রথম অমিল যেটা আমাদের চোখে পড়ল সেটা ওর রঙ এত উজ্জ্বল নীল রং কোন কোয়েলের আছে সেটা আমাদের কিছুতেই মনে আসছিল না, বিশেষ করে অভিষেকের, অগত্যা ভরসা Google Image, আর Richard Grimmet এর বই, কিন্তু একি যার সঙ্গে মিল পাওয়া যাচ্ছে তিনি তো মহারাজ। কিন্তু তার উপস্থিতির কোনো নির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না ebird এ। সত্যি বলতে কি যা রেকর্ড পাওয়া যাচ্ছিল India থেকে সবটাই দক্ষিণ ভারত থেকে।  অবশেষে আমাদের আশাই সত্যি হলো, আমরা "King Quail" এর দেখাই পেয়েছি। আনন্দ, উত্তেজনায় আমরা উদ্বেলিত হয়ে উঠেছি, কিন্তু করণীয় কি তাও ঠিক করাটা খুব জরুরি।অভিজ্ঞ পক্ষীবিশারদ জয়ন্ত মান্না দা যখন কনফার্ম করলেন যে আমরা যে পাখিটি দেখেছি তা "King Quail" বা " Blue Breasted Quail"  যার বিজ্ঞানসম্মত নাম - Synoicus chinensis

একে একে কলকাতা তথা পশ্চিমবঙ্গের অনেক অভিজ্ঞ ও দায়িত্বশীল পক্ষী বিশারদের মধ্যে অন্যতম সন্দীপ দাস, অতনু মোদক দের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারা গেলো, সত্যিই এর দুর্লভতা। আর একজনের কথা বিশেষ ভাবে বলতে হয়, সায়ন ত্রিপাঠি দাদার কথা, ১৬ই জুলাই ২০১৯ তারিখ এ "এইসময়" পত্রিকা তে আমাদের এই মহারাজার ছবি সমেত একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেন।  পরবর্তী কালে "Birdwatcher's Society of Bengal"  তরফ থেকে Santanu Manna  দার সহযোগিতায় তাদের মূল্যবান Data Archive থেকে record যা জানা গেলো, তাতে আমাদের আনন্দ আরো বেড়ে গেলো, আমাদের  ছবিটি পশ্চিমবঙ্গ থেকে King Quail এর 
"First Photographical Record"

Comments

  1. অসাধারণ লেখা দাদা 😍❤️

    ReplyDelete
  2. দারুণ লাগল। ছবি তৈরীর প্রেক্ষাপট জানার সৌভাগ্য হল।

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

ডানলিন

ভালোলাগার ভরতপুর - প্রথম পর্ব